স্ত্রী ছাড়াও যাদের সাথে সহবাস করা জায়েজ! ইসলামি শরিয়তের বিস্তারিত ব্যাখ্যা
স্ত্রী ছাড়াও যাদের সাথে সহবাস করা জায়েজ: ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে বিস্তারিত বিশ্লেষণ
ইসলাম মানুষের স্বাভাবিক চাহিদা ও প্রবৃত্তিকে অস্বীকার করে না; বরং তা সঠিক নিয়ম ও সীমার মধ্যে পরিচালনার জন্য সুস্পষ্ট বিধান দিয়েছে। যৌন সম্পর্ক বা সহবাস ইসলামে একটি পবিত্র বিষয়, তবে এটি কেবল বৈধ সম্পর্কের মধ্যেই অনুমোদিত। আল্লাহ তাআলা মানুষের জন্য বিবাহের ব্যবস্থা করেছেন এবং এর মাধ্যমে পরিবার, বংশ ও সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষা করেছেন।
অনেকের মনে প্রশ্ন আসে—স্ত্রী ছাড়াও ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী আর কার সাথে সহবাস করা বৈধ? এই বিষয়ে কোরআন ও সুন্নাহতে বিস্তারিত নির্দেশনা রয়েছে। বিষয়টি বুঝতে হলে ইসলামের পারিবারিক আইন, বিবাহের বিধান এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা প্রয়োজন।
এই নিবন্ধে কোরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে আলোচনা করা হবে, স্ত্রী ছাড়াও কোন সম্পর্কগুলো ইসলামী শরিয়তে বৈধ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে এবং কোন সম্পর্কগুলো সম্পূর্ণ হারাম।
ইসলামে সহবাসের মূলনীতি
ইসলামের মূলনীতি হলো—যে কোনো যৌন সম্পর্ক বৈধ হওয়ার জন্য শরিয়তসম্মত কারণ থাকতে হবে। ইসলাম অবাধ যৌন সম্পর্ককে অনুমোদন দেয় না। বরং নারী ও পুরুষের সম্পর্ককে বিবাহের মাধ্যমে বৈধ ও মর্যাদাপূর্ণ করেছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
"আর যারা নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। তবে তাদের স্ত্রীদের অথবা তাদের অধিকারভুক্ত দাসীদের ক্ষেত্রে নয়, এতে তারা নিন্দনীয় হবে না।"
—সূরা আল-মুমিনুন: ৫-৬
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা বৈধ যৌন সম্পর্কের দুটি ঐতিহাসিক ক্ষেত্র উল্লেখ করেছেন:
১. স্ত্রী
২. অধিকারভুক্ত দাসী (যা ইসলামের প্রাচীন যুদ্ধ ও সামাজিক ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল)
তবে বর্তমান যুগে দাসপ্রথা বিলুপ্ত হওয়ায় দ্বিতীয় বিষয়টি বাস্তবে প্রযোজ্য নয়। বর্তমানে ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী বৈধ যৌন সম্পর্কের প্রধান ও প্রচলিত মাধ্যম হলো বিবাহ।
স্ত্রী ছাড়া সহবাসের বৈধ সম্পর্ক বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
ইসলামের প্রাথমিক যুগে সমাজব্যবস্থা বর্তমানের মতো ছিল না। যুদ্ধ, বন্দিত্ব ও দাসপ্রথার কারণে "মা মালাকাত আইমানুকুম" বা "ডান হাতের অধিকারভুক্ত" দাসীদের বিষয়টি কোরআনে এসেছে।
তবে এ বিষয়টি নিয়ে অনেক ভুল ধারণা রয়েছে। ইসলাম দাসপ্রথা সৃষ্টি করেনি; বরং বিদ্যমান একটি সামাজিক ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং ধীরে ধীরে দাসমুক্তির পথ তৈরি করেছে।
কোরআন ও হাদিসে দাস মুক্ত করাকে বহু ক্ষেত্রে নেক কাজ ও কাফফারার মাধ্যম হিসেবে উৎসাহিত করা হয়েছে।
আল্লাহ বলেন:
"সে কঠিন পথ অতিক্রম করেনি। আর তা কী? তা হলো কোনো দাসকে মুক্ত করা।"
—সূরা আল-বালাদ: ১১-১৩
বর্তমান সময়ে পৃথিবীর প্রায় সব সমাজেই দাসপ্রথা বিলুপ্ত। তাই ইসলামী ফিকহের আলোচনায় এই বিষয়টি ঐতিহাসিক বিধান হিসেবে বিবেচিত হয়, বাস্তব জীবনের অনুমোদিত সম্পর্ক হিসেবে নয়।
বর্তমান যুগে স্ত্রী ছাড়া কার সাথে সহবাস বৈধ?
বর্তমান বাস্তবতায় ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী একজন পুরুষের জন্য স্ত্রী ছাড়া অন্য কোনো স্বাধীন নারীর সাথে যৌন সম্পর্ক বৈধ নয়।
অর্থাৎ:
প্রেমিকা
বান্ধবী
পরিচিত নারী
গোপন সম্পর্কের নারী
অবিবাহিত সঙ্গী
কারো সাথেই বিবাহ ছাড়া সহবাস করা ইসলামে বৈধ নয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
"আর তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেও না। নিশ্চয়ই তা অশ্লীল এবং নিকৃষ্ট পথ।"
—সূরা আল-ইসরা: ৩২
এই আয়াতে শুধু ব্যভিচার নিষিদ্ধ করা হয়নি; বরং ব্যভিচারের দিকে নিয়ে যায় এমন পথ থেকেও দূরে থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিবাহ ছাড়া সম্পর্ক কেন নিষিদ্ধ?
ইসলামে বিবাহ শুধু একটি সামাজিক চুক্তি নয়; এটি দায়িত্ব, অধিকার ও পবিত্র সম্পর্কের বন্ধন।
বিবাহের মাধ্যমে:
নারী তার অধিকার লাভ করে
পুরুষ দায়িত্ব গ্রহণ করে
সন্তানের পরিচয় ও বংশ সংরক্ষিত হয়
পরিবার কাঠামো শক্তিশালী হয়
সমাজে নৈতিক শৃঙ্খলা বজায় থাকে
অন্যদিকে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক অনেক সময়:
পরিবার ভাঙনের কারণ হয়
মানসিক অশান্তি সৃষ্টি করে
সন্তানের অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত করে
সামাজিক বিশৃঙ্খলা তৈরি করে
এ কারণেই ইসলাম যৌন সম্পর্ককে স্বাধীনতার নামে উন্মুক্ত করেনি; বরং দায়িত্বশীল ও বৈধ কাঠামোর মধ্যে রেখেছে।
কোরআনের আলোকে বৈধ সম্পর্কের সীমারেখা
আল্লাহ তাআলা বলেন:
"তোমাদের জন্য বৈধ করা হয়েছে পবিত্র নারীগণ এবং তাদের মধ্য থেকে যাদের তোমরা বিবাহ করো..."
—সূরা আন-নিসা: ২৪
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, নারীর সাথে বৈধ সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো বিবাহ।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"হে যুবসমাজ! তোমাদের মধ্যে যে বিবাহের সামর্থ্য রাখে, সে যেন বিবাহ করে। কারণ এটি দৃষ্টি সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থান হেফাজত করে।"
—সহিহ আল-বুখারি: ৫০৬৬, সহিহ মুসলিম: ১৪০০
এই হাদিসে রাসুল ﷺ যুবকদের জন্য যৌন চাহিদা পূরণের বৈধ পথ হিসেবে বিবাহের নির্দেশ দিয়েছেন।
একাধিক স্ত্রী রাখার বিধান
ইসলাম একজন পুরুষকে নির্দিষ্ট শর্তে একাধিক বিবাহের অনুমতি দিয়েছে। তবে এটি কোনো বাধ্যতামূলক বিষয় নয় এবং এর জন্য কঠোর দায়িত্ব পালনের শর্ত রয়েছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
"তোমরা পছন্দমতো নারীদের মধ্যে দুই, তিন অথবা চারজনকে বিবাহ করো। কিন্তু যদি আশঙ্কা করো যে, তাদের মধ্যে ন্যায়বিচার করতে পারবে না, তবে একজনকেই (বিবাহ করো)।"
—সূরা আন-নিসা: ৩
এই আয়াতের মূল বিষয় হলো ন্যায়বিচার। একাধিক বিবাহের অনুমতি দেওয়া হলেও স্ত্রীদের অধিকার রক্ষা করা, সমান আচরণ করা এবং দায়িত্ব পালন করা অপরিহার্য।
ইসলাম কি অবাধ যৌন স্বাধীনতা সমর্থন করে?
ইসলাম মানুষের স্বাভাবিক চাহিদাকে স্বীকার করে, কিন্তু সেই চাহিদা পূরণের জন্য নৈতিক ও বৈধ পথ নির্ধারণ করেছে।
পশ্চিমা বিশ্বের অনেক সমাজে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার নামে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক স্বাভাবিক হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে যৌন সম্পর্ক কেবল ব্যক্তিগত আনন্দের বিষয় নয়; এর সঙ্গে পরিবার, বংশ ও সমাজের ভবিষ্যৎ জড়িত।
তাই ইসলাম যৌনতাকে অপবিত্র মনে করে না; বরং বৈধ সম্পর্কের মাধ্যমে এটিকে সম্মানজনক ও পবিত্র করেছে।
ইসলামের প্রাথমিক যুগের দাসীদের বিষয়টি কীভাবে বুঝতে হবে?
"মা মালাকাত আইমানুকুম" বিষয়টি বোঝার জন্য ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট জানা জরুরি।
প্রাচীন পৃথিবীতে প্রায় সব সভ্যতাতেই দাসপ্রথা প্রচলিত ছিল। যুদ্ধবন্দীদের নিয়ে বিভিন্ন সমাজে কঠোর ও অমানবিক আচরণ করা হতো। ইসলাম এই ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করে:
দাসদের মানবিক অধিকার দিয়েছে
দাস মুক্ত করাকে উৎসাহিত করেছে
দাসদের প্রতি উত্তম আচরণের নির্দেশ দিয়েছে
মুক্তির পথ সহজ করেছে
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"তোমাদের অধীনস্থরা তোমাদের ভাই। আল্লাহ তাদের তোমাদের অধীনে রেখেছেন। সুতরাং তোমরা যা খাবে তাদেরও তা খাওয়াবে এবং যা পরবে তাদেরও তা পরাবে।"
—সহিহ আল-বুখারি: ২৫৪৫, সহিহ মুসলিম: ১৬৬১
বর্তমান যুগে যেহেতু বৈধ দাসপ্রথা বিদ্যমান নেই, তাই এই বিধানকে বর্তমান সমাজের ওপর প্রয়োগ করার সুযোগ নেই।
(পর্ব-১ সমাপ্ত)
পর্ব-২ এ থাকবে:
দাসপ্রথা বিলুপ্তির পর ইসলামী বিধান কীভাবে প্রযোজ্য
স্ত্রী ছাড়া সম্পর্কের বিষয়ে প্রচলিত ভুল ধারণার জবাব
ব্যভিচার সম্পর্কে কোরআন-সুন্নাহর সতর্কতা
বৈধ দাম্পত্য জীবনের ইসলামী নির্দেশনা
অনিয়মিত মাসিক: কারণ, লক্ষণ, ঝুঁকি ও কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি
স্ত্রীর বুকের দুধ পান করা কি হারাম? এতে কি স্ত্রী স্বামীর জন্য হারাম হয়ে যায়?
নারী-পুরুষের যৌন চাহিদা: শারীরিক, মানসিক ও বৈবাহিক জীবনে এর গুরুত্ব
টেস্টোস্টেরন বা যৌন হরমোন বাড়াতে যে খাবার খাবেন। টেস্টোস্টেরন বাড়ানোর খাবার
যৌ*ন ক্ষমতা বৃদ্ধি করে যেসব খাবার: বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত খাদ্যাভ্যাস ও পূর্ণাঙ্গ গাইড
স্ত্রীর বুকের দুধ পান করা কি হারাম? এতে কি স্ত্রী স্বামীর জন্য হারাম হয়ে যায়?
স্বামী-স্ত্রী একজন আরেকজনের লজ্জাস্থান মুখে নেওয়া কি জায়েজ আছে কি?
স্বামী স্ত্রী একজন আরেকজনের লজ্জাস্থান চুষতে পারবে কি?
স্ত্রীর লজ্জা*স্থান চো*ষা যাবে কি? স্ত্রীর লজ্জা*স্থানে মুখ দেওয়া যাবে কি?
স্ত্রীর দুধ পান করা যাবে কিনা? কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে
স্বামী স্ত্রীর যৌন মিলন বা সহবাসের নিয়ম
কনডম ব্যবহার করা কি ইসলামে জায়েয? কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে
কিছু ভন্ড হুজুর দের তালিকা | চিনে রাখুন। ভণ্ড ধর্মীয় বক্তা চেনার উপায়
কনডম ব্যবহার করা কি ইসলামে জায়েয? কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে
স্ত্রী ছাড়াও যাদের সাথে সহবাস করা জায়েজ: ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে বিস্তারিত বিশ্লেষণ (পর্ব-২)
দাসপ্রথা বিলুপ্তির পর ইসলামী বিধান কীভাবে প্রযোজ্য?
ইসলামী শরিয়তের বিধান বুঝতে হলে সময়, স্থান ও বাস্তব পরিস্থিতির বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন। ইসলামের প্রাথমিক যুগে দাসপ্রথা একটি প্রচলিত সামাজিক বাস্তবতা ছিল। কোরআন সেই বিদ্যমান ব্যবস্থার মধ্যে মানবিক সংস্কার এনেছে এবং দাস মুক্তির প্রতি উৎসাহ দিয়েছে।
বর্তমান যুগে অধিকাংশ মুসলিম আলেমের মতে, যেহেতু বৈধ দাসপ্রথা আর বিদ্যমান নেই এবং আন্তর্জাতিকভাবে এই ব্যবস্থা বিলুপ্ত হয়েছে, তাই "অধিকারভুক্ত দাসী" সম্পর্কিত বিধান বর্তমান সমাজে প্রযোজ্য নয়।
বর্তমান ইসলামী বিধান অনুযায়ী একজন পুরুষের জন্য স্ত্রী ছাড়া অন্য কোনো নারীর সাথে যৌন সম্পর্ক বৈধ নয়। বৈধ সম্পর্কের একমাত্র প্রচলিত মাধ্যম হলো শরিয়তসম্মত বিবাহ।
ইসলামের দৃষ্টিতে নারী-পুরুষের সম্পর্কের ভিত্তি হলো সম্মান, দায়িত্ব ও বৈধ চুক্তি। শুধু ভালো লাগা, আবেগ বা পারস্পরিক সম্মতি কোনো সম্পর্ককে ইসলামী দৃষ্টিতে বৈধ করে না।
স্ত্রী ছাড়া অন্য নারীর সাথে সম্পর্ক সম্পর্কে ইসলামের অবস্থান
অনেক সময় সমাজে এমন ধারণা দেখা যায় যে, দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ যদি নিজেদের ইচ্ছায় কোনো সম্পর্কে জড়ায়, তাহলে এতে সমস্যা নেই। কিন্তু ইসলামী দৃষ্টিতে যৌন সম্পর্ক কেবল ব্যক্তিগত ইচ্ছার বিষয় নয়; বরং এটি আল্লাহর নির্ধারিত সীমার মধ্যে থাকা একটি বিষয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
"আর যারা নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে, নিজেদের স্ত্রী ও অধিকারভুক্তদের ছাড়া; নিশ্চয়ই তারা নিন্দিত হবে না। অতঃপর যারা এর বাইরে কিছু কামনা করে, তারাই সীমালঙ্ঘনকারী।"
—সূরা আল-মুমিনুন: ৫-৭
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, ইসলামে বৈধ সীমার বাইরে যৌন সম্পর্ককে গ্রহণযোগ্য মনে করা হয়নি।
প্রেমের সম্পর্ক ও ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি
ইসলাম ভালোবাসাকে নিষিদ্ধ করেনি। বরং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা, দয়া ও মমতাকে আল্লাহর নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করেছে।
আল্লাহ বলেন:
"আর তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে রয়েছে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে সঙ্গী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করো এবং তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া স্থাপন করেছেন।"
—সূরা আর-রূম: ২১
তবে ইসলাম এমন ভালোবাসাকে উৎসাহিত করে যা বৈধ ও দায়িত্বপূর্ণ সম্পর্কের দিকে এগিয়ে যায়। বিবাহ ছাড়া গোপন প্রেম বা শারীরিক সম্পর্ক ইসলামী বিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ব্যভিচার সম্পর্কে কোরআন ও সুন্নাহর সতর্কতা
ইসলাম ব্যভিচারকে বড় ধরনের গুনাহ হিসেবে উল্লেখ করেছে। কারণ এটি শুধু ব্যক্তিগত অপরাধ নয়; এর প্রভাব পরিবার ও সমাজের ওপর পড়ে।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
"তোমরা ব্যভিচারের নিকটবর্তী হয়ো না। নিশ্চয়ই তা অশ্লীল এবং খুবই নিকৃষ্ট পথ।"
—সূরা আল-ইসরা: ৩২
এখানে আল্লাহ শুধু ব্যভিচার থেকে নিষেধ করেননি; বরং এর কাছাকাছি যাওয়ার পথও বন্ধ করতে বলেছেন। অর্থাৎ এমন কাজ, পরিবেশ ও সম্পর্ক থেকেও দূরে থাকতে বলা হয়েছে যা মানুষকে হারামের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"যখন কোনো ব্যক্তি ব্যভিচার করে, তখন সে পূর্ণ ঈমানের অবস্থায় তা করে না।"
—সহিহ আল-বুখারি: ২৪৭৫, সহিহ মুসলিম: ৫৭
এই হাদিসের উদ্দেশ্য হলো মানুষকে এই বড় গুনাহ থেকে সতর্ক করা এবং ঈমান রক্ষার প্রতি উৎসাহিত করা।
বিবাহের মাধ্যমে যৌন সম্পর্ক কেন বৈধ করা হয়েছে?
ইসলামে বিবাহের উদ্দেশ্য শুধু যৌন চাহিদা পূরণ নয়। বরং এর মাধ্যমে:
একটি নিরাপদ পরিবার গড়ে ওঠে
স্বামী ও স্ত্রীর অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়
সন্তানদের পরিচয় ও দায়িত্ব নিশ্চিত হয়
সমাজে নৈতিকতা বজায় থাকে
নারী ও পুরুষ উভয়ের মর্যাদা রক্ষা হয়
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"দুনিয়ার সবচেয়ে উত্তম সম্পদ হলো নেককার স্ত্রী।"
—সহিহ মুসলিম: ১৪৬৭
এ থেকে বোঝা যায়, ইসলাম দাম্পত্য সম্পর্ককে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ স্থান দিয়েছে।
একাধিক বিবাহ সম্পর্কে ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি
ইসলাম নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে একাধিক বিবাহের অনুমতি দিয়েছে। তবে এটিকে কোনো অবাধ সুযোগ হিসেবে দেওয়া হয়নি।
আল্লাহ বলেন:
"যদি তোমরা আশঙ্কা করো যে, তোমরা ন্যায়বিচার করতে পারবে না, তাহলে একজনকেই বিবাহ করো।"
—সূরা আন-নিসা: ৩
অর্থাৎ একাধিক বিবাহের ক্ষেত্রে:
আর্থিক সামর্থ্য থাকতে হবে
স্ত্রীদের অধিকার আদায় করতে হবে
সময় ও আচরণে ন্যায়বিচার করতে হবে
দায়িত্ব পালনে সক্ষম হতে হবে
শুধু কামনা পূরণের উদ্দেশ্যে বিবাহের বিধানকে ব্যবহার করা ইসলামের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ইসলামে যৌন পবিত্রতার গুরুত্ব
ইসলাম মানুষের চরিত্র গঠনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। একজন মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করা।
আল্লাহ বলেন:
"আর যারা নিজেদের লজ্জাস্থান সংরক্ষণ করে।"
—সূরা আল-মা'আরিজ: ২৯
নিজেকে হারাম থেকে রক্ষা করা শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয়; এটি একজন মুসলিমের ইবাদতের অংশ।
প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা
ভুল ধারণা: ইসলাম স্ত্রী ছাড়া যেকোনো সম্পর্ক অনুমোদন করে
এটি সঠিক নয়। ইসলামে বৈধ সম্পর্কের জন্য নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। বর্তমান সময়ে বিবাহ ছাড়া কোনো যৌন সম্পর্ক বৈধ নয়।
ভুল ধারণা: ইসলামে শুধু পুরুষের অধিকার আছে
এটিও ভুল ধারণা। ইসলাম নারী ও পুরুষ উভয়ের অধিকার, সম্মান ও নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়েছে।
বিবাহের ক্ষেত্রে যেমন পুরুষের দায়িত্ব রয়েছে, তেমনি নারীরও অধিকার রয়েছে।
ভুল ধারণা: বিবাহ শুধু সামাজিক প্রথা
ইসলামের দৃষ্টিতে বিবাহ একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত ও দায়িত্বপূর্ণ চুক্তি। এর মাধ্যমে একজন নারী ও পুরুষ বৈধভাবে জীবন পরিচালনা করে।
ইসলামী দৃষ্টিতে উত্তম জীবনযাপন
একজন মুসলিমের উচিত নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করা, আল্লাহর বিধান অনুসরণ করা এবং বৈধ পথে জীবন পরিচালনা করা।
যারা বিবাহের সামর্থ্য রাখেন, তাদের জন্য বিবাহ উত্তম পথ। আর যারা কোনো কারণে বিবাহ করতে পারছেন না, তাদের জন্য ইসলাম সংযম ও আত্মনিয়ন্ত্রণের শিক্ষা দিয়েছে।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"হে যুবসমাজ! তোমাদের মধ্যে যার সামর্থ্য আছে সে যেন বিবাহ করে। আর যার সামর্থ্য নেই সে যেন রোজা রাখে, কারণ রোজা তার জন্য ঢালস্বরূপ।"
—সহিহ আল-বুখারি: ৫০৬৬, সহিহ মুসলিম: ১৪০০
উপসংহার
ইসলামের দৃষ্টিতে যৌন সম্পর্ক একটি স্বাভাবিক মানবিক বিষয়, তবে এটি অবশ্যই আল্লাহ নির্ধারিত সীমার মধ্যে হতে হবে। বর্তমান যুগে স্ত্রী ছাড়া অন্য কোনো নারীর সাথে সহবাস ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী বৈধ নয়। বৈধ সম্পর্কের প্রধান মাধ্যম হলো বিবাহ।
কোরআন ও সুন্নাহ মানুষের প্রবৃত্তিকে অস্বীকার করেনি; বরং তা নিয়ন্ত্রণ করে সুন্দর, পবিত্র ও দায়িত্বশীল জীবন গঠনের নির্দেশ দিয়েছে। বিবাহের মাধ্যমে ভালোবাসা, শান্তি ও পরিবার প্রতিষ্ঠিত হয়, আর অবৈধ সম্পর্ক ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে।
একজন মুসলিমের দায়িত্ব হলো কোরআন ও সহিহ সুন্নাহর নির্দেশনা অনুসরণ করে নিজের জীবন পরিচালনা করা এবং হারাম থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
রেফারেন্স যাচাই সংক্রান্ত সতর্কতা
এই নিবন্ধে কোরআনের আয়াত ও হাদিসের রেফারেন্স উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকাশের আগে পাঠকদের জন্য আরও নির্ভুলতার স্বার্থে সংশ্লিষ্ট আয়াতের অনুবাদ ও হাদিস নম্বর নির্ভরযোগ্য ইসলামিক গ্রন্থ (যেমন সহিহ আল-বুখারি, সহিহ মুসলিম এবং স্বীকৃত তাফসির গ্রন্থ) থেকে যাচাই করে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন প্রকাশনায় হাদিস নম্বরের পার্থক্য থাকতে পারে।
ইসলামে সহবাসের নিয়ম, বিবাহ ছাড়া সম্পর্ক ইসলাম, কোরআনে যৌন সম্পর্ক, ইসলামী বিবাহের বিধান, ব্যভিচার সম্পর্কে ইসলাম।
ইসলামী জ্ঞান, শিক্ষা ও সচেতনতার নির্ভরযোগ্য বাংলা প্ল্যাটফর্ম
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আমি জাইমা আরোহি। IslamiTune-এ আপনাকে আন্তরিক স্বাগতম।
লেখক: জাইমা আরোহি
IslamiTune একটি বাংলা ইসলামিক শিক্ষামূলক ও তথ্যভিত্তিক ওয়েবসাইট। আমাদের লক্ষ্য হলো কুরআন, সহিহ সুন্নাহ এবং গ্রহণযোগ্য ইসলামী স্কলারদের ব্যাখ্যার আলোকে নির্ভরযোগ্য ইসলামিক জ্ঞান সহজ, সুন্দর ও বোধগম্য ভাষায় বাংলা ভাষাভাষী পাঠকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
