ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিয়ের জন্য আদর্শ পাত্র-পাত্রী নির্বাচন | কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিয়ের জন্য কেমন পাত্র-পাত্রী নির্বাচন করা জরুরি?
বিয়ে ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত এবং মানবজীবনের একটি মৌলিক প্রতিষ্ঠান। এটি শুধু একজন নারী ও একজন পুরুষের একত্রে বসবাসের অনুমতি নয়; বরং এটি আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে একটি পবিত্র অঙ্গীকার (মীসাকুন গালীয)। একটি সুখী পরিবার, আদর্শ সমাজ এবং দ্বীনের সুরক্ষার জন্য সঠিক জীবনসঙ্গী নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আজকের সমাজে অনেকেই বিয়ের ক্ষেত্রে সৌন্দর্য, অর্থ-সম্পদ, উচ্চশিক্ষা, চাকরি, সামাজিক মর্যাদা কিংবা পারিবারিক অবস্থানকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন। অথচ ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে, এসব বিষয় বিবেচনায় আসতে পারে, কিন্তু প্রকৃত অগ্রাধিকার হওয়া উচিত ঈমান, তাকওয়া, উত্তম চরিত্র এবং দ্বীনের প্রতি আন্তরিকতা।
এই নিবন্ধে আমরা কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর আলোকে জানব—কেমন পাত্র বা পাত্রী নির্বাচন করা উচিত, কেন ধর্মীয় গুণাবলিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন এবং কোন বিষয়গুলো একজন মুসলিমের জন্য বিয়ের সিদ্ধান্তে অপরিহার্য।
ইসলামে বিয়ের উদ্দেশ্য কী?
আল্লাহ তাআলা বলেন—
"আর তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে একটি হলো, তিনি তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের জন্য জোড়া সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ কর। আর তিনি তোমাদের মধ্যে সৃষ্টি করেছেন ভালোবাসা ও দয়া। এতে অবশ্যই চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন রয়েছে।"
— সূরা আর-রূম, আয়াত ২১
এই আয়াত থেকে আমরা তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানতে পারি—
দাম্পত্য জীবনের মূল উদ্দেশ্য প্রশান্তি।
স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের ভিত্তি ভালোবাসা।
সংসার টিকে থাকে পারস্পরিক দয়া ও সহানুভূতির মাধ্যমে।
অর্থাৎ, বিয়ে কেবল সামাজিক প্রয়োজন নয়; এটি একটি ইবাদত এবং আল্লাহর নিদর্শন।
কেন সঠিক জীবনসঙ্গী নির্বাচন এত গুরুত্বপূর্ণ?
একজন মানুষ তার জীবনের সবচেয়ে বেশি সময় কাটায় তার জীবনসঙ্গীর সঙ্গে। তার ঈমান, সন্তানদের শিক্ষা, পারিবারিক পরিবেশ, মানসিক শান্তি—সবকিছুর উপর জীবনসঙ্গীর গভীর প্রভাব পড়ে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
"আর পৃথিবীর সর্বোত্তম সম্পদ হলো নেককার স্ত্রী।"
— সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৪৬৭
অন্যদিকে, একজন দ্বীনদার স্বামীও একজন নারীর জন্য আল্লাহর বড় নিয়ামত।
অতএব, ভুল মানুষকে বিয়ে করলে দুনিয়া ও আখিরাত—উভয় ক্ষেত্রেই ক্ষতির আশঙ্কা থাকে।
পাত্র-পাত্রী নির্বাচনের সর্বপ্রথম মানদণ্ড: দ্বীনদারিতা
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
"নারীকে সাধারণত চারটি বিষয়ের জন্য বিয়ে করা হয়—তার সম্পদ, বংশ-মর্যাদা, সৌন্দর্য এবং দ্বীনদারিতা। অতএব, তুমি দ্বীনদার নারীকে অগ্রাধিকার দাও; তাহলে তুমি সফল হবে।"
— সহিহ আল-বুখারি, হাদিস: ৫০৯০; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৪৬৬
এই হাদিসটি মুসলিম সমাজে বিয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনাগুলোর একটি।
এখানে রাসূল ﷺ অন্য বিষয়গুলোকে নিষিদ্ধ করেননি। বরং তিনি বলেছেন, সবকিছুর উপরে দ্বীনকে প্রাধান্য দিতে হবে।
কারণ—
সৌন্দর্য সময়ের সঙ্গে কমে যেতে পারে।
সম্পদ হারিয়ে যেতে পারে।
সামাজিক মর্যাদা পরিবর্তিত হতে পারে।
কিন্তু তাকওয়া ও আল্লাহভীতি একজন মানুষকে সব অবস্থায় উত্তম আচরণ করতে উদ্বুদ্ধ করে।
একজন দ্বীনদার মানুষের বৈশিষ্ট্য কী?
অনেকে মনে করেন শুধু পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়লেই একজন মানুষ দ্বীনদার।
কিন্তু ইসলামে দ্বীনদারিতা আরও ব্যাপক।
একজন প্রকৃত দ্বীনদার ব্যক্তি—
ফরজ ইবাদতের প্রতি যত্নবান।
হারাম থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করেন।
মিথ্যা বলেন না।
আমানত রক্ষা করেন।
মানুষের হক নষ্ট করেন না।
রাগ নিয়ন্ত্রণ করেন।
পরিবারকে সম্মান করেন।
আল্লাহকে ভয় করেন।
অর্থাৎ, তার চরিত্রে ইসলামের প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
চরিত্র (আখলাক) কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
"তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি সেই, যে তার স্ত্রীর প্রতি সর্বোত্তম আচরণ করে। আর আমি আমার স্ত্রীদের প্রতি তোমাদের সবার চেয়ে উত্তম আচরণকারী।"
— জামে আত-তিরমিযি, হাদিস: ৩৮৯৫ (সহিহ)
সুন্দর চরিত্র ছাড়া সুন্দর সংসার সম্ভব নয়।
অনেক সময় দেখা যায়—
ব্যক্তি নামাজ পড়ে,
রোজা রাখে,
কিন্তু—
রাগী,
অহংকারী,
অপমানজনক ভাষা ব্যবহার করে,
স্ত্রী বা স্বামীর অধিকার নষ্ট করে।
এ ধরনের আচরণ ইসলামের শিক্ষা নয়।
পাত্র নির্বাচনের ক্ষেত্রে কনের অভিভাবকের করণীয়
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
"যখন এমন ব্যক্তি তোমাদের কাছে বিবাহের প্রস্তাব নিয়ে আসে যার দ্বীন ও চরিত্র তোমাদের সন্তুষ্ট করে, তখন তার সঙ্গে বিবাহ সম্পন্ন করো। যদি তা না করো, তাহলে পৃথিবীতে ফিতনা ও ব্যাপক বিপর্যয় সৃষ্টি হবে।"
— জামে আত-তিরমিযি, হাদিস: ১০৮৪ (হাসান)
এই হাদিসে দুটি বিষয়কে শর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে—
১. দ্বীন
২. চরিত্র
লক্ষ্য করুন—
এখানে ধন-সম্পদ, চাকরি কিংবা সামাজিক মর্যাদাকে প্রধান শর্ত করা হয়নি।
অবশ্যই একজন মানুষের উপার্জনের সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ। তবে দ্বীন ও চরিত্র ছাড়া কেবল অর্থ দিয়ে সুখী সংসার নিশ্চিত করা যায় না।
পাত্রী নির্বাচনের ক্ষেত্রেও একই নীতি
অনেকেই মনে করেন, দ্বীনদার হওয়া শুধু মেয়েদের জন্য জরুরি।
এটি ভুল ধারণা।
কুরআনে আল্লাহ তাআলা নারী ও পুরুষ উভয়কেই তাকওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
আল্লাহ বলেন—
"নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট তোমাদের মধ্যে সে-ই সর্বাধিক সম্মানিত, যে সর্বাধিক তাকওয়াবান।"
— সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত ১৩
অতএব—
একজন ছেলে যেমন দ্বীনদার স্ত্রী খুঁজবে,
তেমনি একজন মেয়েও দ্বীনদার স্বামী খুঁজবে।
বংশ-মর্যাদা কি বিবেচনা করা যাবে?
ইসলাম বংশকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেনি।
ভালো পরিবারে বেড়ে ওঠা মানুষের মধ্যে অনেক সময় ভালো শিক্ষা ও মূল্যবোধ পাওয়া যায়।
তবে বংশকে কখনো দ্বীনের উপরে স্থান দেওয়া যাবে না।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বিদায় হজের ভাষণে বলেছেন—
"কোনো আরবের উপর অনারবের, অনারবের উপর আরবের, শ্বেতাঙ্গের উপর কৃষ্ণাঙ্গের কিংবা কৃষ্ণাঙ্গের উপর শ্বেতাঙ্গের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই; শ্রেষ্ঠত্ব কেবল তাকওয়ার মাধ্যমে।"
— মুসনাদ আহমাদ, হাদিস: ২২৯৭৮ (অর্থগতভাবে সহিহ বর্ণনা দ্বারা সমর্থিত)
অতএব—
জাতি, বংশ কিংবা গোত্রের অহংকার ইসলামের শিক্ষা নয়।
সৌন্দর্যের গুরুত্ব কতটুকু?
ইসলাম সৌন্দর্যকে অস্বীকার করেনি।
বরং বিয়ের আগে পাত্র-পাত্রী একে অপরকে শরিয়তের সীমার মধ্যে দেখে নেওয়ার অনুমতি রয়েছে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ এক সাহাবিকে বলেছিলেন—
"তুমি তাকে দেখে নাও; এতে তোমাদের মধ্যে স্থায়ী সম্পর্ক গড়ে ওঠার সম্ভাবনা বেশি।"
— সুনান আন-নাসাঈ, হাদিস: ৩২৩৫; জামে আত-তিরমিযি, হাদিস: ১০৮৭
তবে সৌন্দর্যই যদি একমাত্র মানদণ্ড হয়, তাহলে পরবর্তীতে হতাশা সৃষ্টি হতে পারে।
স্থায়ী দাম্পত্যের ভিত্তি কেবল বাহ্যিক আকর্ষণ নয়; বরং ঈমান, সম্মান, দায়িত্ববোধ ও উত্তম চরিত্র।
ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে, বিয়ের সিদ্ধান্ত কেবল আবেগ, সামাজিক চাপ বা বাহ্যিক চাকচিক্যের ওপর ভিত্তি করে নেওয়া উচিত নয়। একজন জীবনসঙ্গী এমন হওয়া প্রয়োজন, যিনি আল্লাহকে ভয় করেন, ইসলামের বিধান মেনে চলার চেষ্টা করেন, উত্তম চরিত্রের অধিকারী এবং পরিবারকে ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধের সঙ্গে পরিচালনা করতে সক্ষম।
কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে দেখা যায়, দ্বীনদারিতা, তাকওয়া এবং উত্তম আখলাক—এই তিনটি গুণই সফল দাম্পত্য জীবনের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি। সম্পদ, সৌন্দর্য, বংশ-মর্যাদা বা সামাজিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু এগুলো কখনোই ঈমান ও চরিত্রের বিকল্প নয়।
পরবর্তী পর্বে আলোচনা করা হবে—
কুফু (সমতা) বা সামঞ্জস্যের ধারণা
আর্থিক দায়িত্ব ও উপার্জনের গুরুত্ব
ইস্তিখারার গুরুত্ব
বিয়ের আগে যেসব বিষয় যাচাই করা উচিত
প্রচলিত ভুল ধারণা ও ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি
কুরআন ও সুন্নাহভিত্তিক বাস্তবসম্মত করণীয়
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিয়ের জন্য কেমন পাত্র-পাত্রী নির্বাচন জরুরি?
কুফু (সমতা) বা সামঞ্জস্যের গুরুত্ব
ইসলামে বিয়ের ক্ষেত্রে কুফু (কাফাআহ) অর্থাৎ পারস্পরিক সামঞ্জস্যের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। যদিও কুরআন ও সুন্নাহ কুফুর জন্য নির্দিষ্ট কোনো একক মানদণ্ড নির্ধারণ করেনি, তবুও ইসলামী ফিকহে দ্বীন, চরিত্র, দায়িত্ববোধ এবং বাস্তব জীবনের সামঞ্জস্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
একজন মানুষ যদি দ্বীনদার হন কিন্তু জীবনযাপন, চিন্তাভাবনা বা দায়িত্ববোধে সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্য থাকে, তাহলে সংসারে অশান্তি সৃষ্টি হতে পারে।
সামঞ্জস্যের কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক—
দ্বীনি মূল্যবোধে মিল।
জীবনের লক্ষ্য ও দৃষ্টিভঙ্গিতে মিল।
পারিবারিক দায়িত্ব সম্পর্কে সমমনা হওয়া।
পারস্পরিক সম্মানবোধ।
যোগাযোগের সক্ষমতা।
বাস্তব জীবনের প্রত্যাশায় ভারসাম্য।
সামঞ্জস্য মানে একেবারে সব বিষয়ে এক হওয়া নয়; বরং মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও ইসলামী আদর্শে একসঙ্গে চলতে পারার যোগ্যতা।
হালাল উপার্জনের গুরুত্ব
একজন পুরুষের জন্য পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
"পুরুষরা নারীদের অভিভাবক, কারণ আল্লাহ তাদের একজনকে অন্যজনের উপর কিছু বৈশিষ্ট্য দিয়েছেন এবং তারা তাদের সম্পদ ব্যয় করে।"
— সূরা আন-নিসা, আয়াত ৩৪
অতএব—
উপার্জনের পরিমাণের চেয়ে উপার্জনের হালাল হওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
অঢেল সম্পদ থাকলেও যদি তা হারাম পথে অর্জিত হয়, তবে তা বরকতহীন।
অল্প হলেও হালাল উপার্জন আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
"নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র; তিনি কেবল পবিত্র (হালাল) জিনিসই গ্রহণ করেন।"
— সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০১৫
বিয়ের সময় তাই শুধু বেতন নয়, উপার্জনের উৎসও বিবেচনা করা উচিত।
আরও পড়ুনঃ
অনিয়মিত মাসিক: কারণ, লক্ষণ, ঝুঁকি ও কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি
স্ত্রীর বুকের দুধ পান করা কি হারাম? এতে কি স্ত্রী স্বামীর জন্য হারাম হয়ে যায়?
নারী-পুরুষের যৌন চাহিদা: শারীরিক, মানসিক ও বৈবাহিক জীবনে এর গুরুত্ব
টেস্টোস্টেরন বা যৌন হরমোন বাড়াতে যে খাবার খাবেন। টেস্টোস্টেরন বাড়ানোর খাবার
যৌ*ন ক্ষমতা বৃদ্ধি করে যেসব খাবার: বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত খাদ্যাভ্যাস ও পূর্ণাঙ্গ গাইড
স্ত্রীর বুকের দুধ পান করা কি হারাম? এতে কি স্ত্রী স্বামীর জন্য হারাম হয়ে যায়?
স্বামী-স্ত্রী একজন আরেকজনের লজ্জাস্থান মুখে নেওয়া কি জায়েজ আছে কি?
স্বামী স্ত্রী একজন আরেকজনের লজ্জাস্থান চুষতে পারবে কি?
স্ত্রীর লজ্জা*স্থান চো*ষা যাবে কি? স্ত্রীর লজ্জা*স্থানে মুখ দেওয়া যাবে কি?
স্ত্রীর দুধ পান করা যাবে কিনা? কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে
স্বামী স্ত্রীর যৌন মিলন বা সহবাসের নিয়ম
কনডম ব্যবহার করা কি ইসলামে জায়েয? কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে
কিছু ভন্ড হুজুর দের তালিকা | চিনে রাখুন। ভণ্ড ধর্মীয় বক্তা চেনার উপায়
কনডম ব্যবহার করা কি ইসলামে জায়েয? কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে
দায়িত্ববোধ একটি বড় গুণ
অনেকেই ভাবেন, অর্থ উপার্জন করলেই একজন ভালো স্বামী বা স্ত্রী হওয়া যায়।
কিন্তু ইসলাম দায়িত্ববোধকে আরও বড় গুণ হিসেবে শিক্ষা দেয়।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
"তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল, এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।"
— সহিহ আল-বুখারি, হাদিস: ৭১৩৮; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৮২৯
দায়িত্বশীল ব্যক্তি—
প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেন।
পরিবারকে সময় দেন।
রাগের সময় সংযমী থাকেন।
স্ত্রী বা স্বামীর অধিকার আদায় করেন।
সন্তানদের দ্বীনি শিক্ষার ব্যবস্থা করেন।
ইস্তিখারা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া
বিয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করা সুন্নাহ।
জাবির (রা.) বলেন—
"রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের সব গুরুত্বপূর্ণ কাজে ইস্তিখারা শিক্ষা দিতেন, যেমন তিনি কুরআনের একটি সূরা শিক্ষা দিতেন।"
— সহিহ আল-বুখারি, হাদিস: ১১৬৬
ইস্তিখারা মানে স্বপ্ন দেখা নয়।
বরং—
আল্লাহর কাছে উত্তম সিদ্ধান্ত চাওয়া।
বৈধ উপায়ে তথ্য যাচাই করা।
পরামর্শ গ্রহণ করা।
তারপর আল্লাহর উপর ভরসা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া।
পরামর্শ (শুরা) গ্রহণের গুরুত্ব
ইসলাম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে পরামর্শ করতে উৎসাহ দেয়।
আল্লাহ বলেন—
"...আর তারা নিজেদের কাজ পারস্পরিক পরামর্শের মাধ্যমে সম্পন্ন করে।"
— সূরা আশ-শূরা, আয়াত ৩৮
বিয়ের ক্ষেত্রে—
বাবা-মায়ের মতামত।
দ্বীনদার ও অভিজ্ঞ মানুষের পরামর্শ।
বিশ্বস্ত আত্মীয়দের মতামত।
এসব গ্রহণ করা উপকারী।
তবে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত শরিয়তসম্মত হওয়া উচিত; কেবল সামাজিক চাপে নয়।
বিয়ের আগে কী কী বিষয় যাচাই করা উচিত?
ইসলাম অন্ধভাবে বিয়ে করতে উৎসাহ দেয় না।
যাচাই করা যেতে পারে—
নামাজ ও ফরজ ইবাদতের প্রতি যত্নশীল কি না।
চরিত্র সম্পর্কে বিশ্বস্ত মানুষের সাক্ষ্য।
হারাম সম্পর্ক থেকে দূরে থাকে কি না।
আমানতদার কি না।
রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে কি না।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আচরণ কেমন।
হালাল উপার্জনের চেষ্টা করে কি না।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বাস্তবসম্মত কি না।
অন্যের গোপন ত্রুটি খোঁজা বা গুপ্তচরবৃত্তি করা ইসলামে নিষিদ্ধ; তবে বৈধ ও বিশ্বস্ত উপায়ে প্রয়োজনীয় তথ্য জেনে নেওয়া বৈধ।
যেসব বিষয়কে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া উচিত নয়
বর্তমান সমাজে অনেক সময় এমন বিষয়কে প্রধান করা হয়, যা ইসলামে মূল মানদণ্ড নয়।
যেমন—
অস্বাভাবিক পরিমাণ মোহরানা বা যৌতুকের দাবি।
কেবল বিদেশে থাকেন বলে অগ্রাধিকার দেওয়া।
কেবল সরকারি চাকরি থাকলেই গ্রহণযোগ্য মনে করা।
গায়ের রঙকে যোগ্যতার মানদণ্ড বানানো।
বিলাসবহুল বিয়ের আয়োজনকে মর্যাদার প্রতীক ভাবা।
সামাজিক মর্যাদার অহংকার।
এসব কারণে অনেক ভালো পাত্র-পাত্রীও উপেক্ষিত হন।
যৌতুক সম্পর্কে ইসলামের অবস্থান
ইসলামে যৌতুক (দাবি করে কনের পক্ষ থেকে সম্পদ গ্রহণ) বৈধ নয়।
বরং ইসলাম স্বামীর ওপর মোহর (মাহর) প্রদানকে ফরজ করেছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
"তোমরা নারীদের তাদের মোহর সন্তুষ্টচিত্তে প্রদান কর।"
— সূরা আন-নিসা, আয়াত ৪
মাহর হলো স্ত্রীর অধিকার।
কিন্তু যৌতুক হলো সামাজিক অন্যায়, যা বহু পরিবারকে কষ্টে ফেলে এবং ইসলামের ন্যায়বিচারের চেতনার পরিপন্থী।
পারস্পরিক সম্মান ও দয়া
সফল দাম্পত্য জীবনের মূল ভিত্তি হলো সম্মান।
রাসূলুল্লাহ ﷺ স্ত্রীদের সঙ্গে কোমল আচরণ করতেন এবং উম্মতকেও সেই শিক্ষা দিয়েছেন।
আল্লাহ বলেন—
"তোমরা তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে বসবাস কর।"
— সূরা আন-নিসা, আয়াত ১৯
এই আয়াত শুধু পুরুষদের জন্য নয়; ইসলামের সামগ্রিক শিক্ষায় স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই একে অপরের প্রতি সদাচরণ, সম্মান ও ন্যায়বিচার বজায় রাখা অপরিহার্য।
বিয়ের আগে আন্তরিক তাওবা
যদি কারও অতীতে ভুল থাকে—
গুনাহ,
হারাম সম্পর্ক,
নামাজে অবহেলা,
তবে আন্তরিক তাওবার দরজা সবসময় খোলা।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
"হে আমার বান্দাগণ, যারা নিজেদের ওপর সীমালঙ্ঘন করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করেন।"
— সূরা আয-যুমার, আয়াত ৫৩
তাই একজন তাওবাকারী ও সংশোধিত মুসলিমকে কেবল অতীতের ভুলের জন্য চিরকাল বিচার করা ইসলামের শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তবে প্রতারণা বা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করাও বৈধ নয়; বিশ্বাস ও সততা বজায় রাখা জরুরি।
একটি আদর্শ মুসলিম জীবনসঙ্গীর বৈশিষ্ট্য
কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে একজন উত্তম পাত্র বা পাত্রীর মধ্যে যেসব গুণ থাকা কাম্য—
বিশুদ্ধ আকিদা ও ঈমান।
পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের প্রতি যত্ন।
আল্লাহভীতি (তাকওয়া)।
উত্তম চরিত্র।
সত্যবাদিতা।
আমানতদারিতা।
হালাল উপার্জন বা হালাল জীবনযাপনের মানসিকতা।
দায়িত্বশীলতা।
ধৈর্য ও ক্ষমাশীলতা।
বাবা-মায়ের প্রতি সম্মান (শরিয়তের সীমার মধ্যে)।
আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা।
গীবত, মিথ্যা ও অহংকার থেকে দূরে থাকার চেষ্টা।
দাম্পত্য জীবনে সহযোগিতার মানসিকতা।
এসব গুণ সম্পূর্ণভাবে একজন মানুষের মধ্যে নাও থাকতে পারে; তবে একজন মুমিনের উচিত এসব গুণ অর্জনের আন্তরিক চেষ্টা করা।
বিয়ে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর একটি। এই সিদ্ধান্ত শুধু দুই ব্যক্তির নয়; দুটি পরিবার, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এবং একটি সমাজের ওপরও প্রভাব ফেলে। তাই ইসলাম আমাদের বাহ্যিক চাকচিক্য, সম্পদ বা সামাজিক মর্যাদার পরিবর্তে ঈমান, তাকওয়া, উত্তম চরিত্র এবং দায়িত্ববোধকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে শিক্ষা দিয়েছে।
একজন দ্বীনদার জীবনসঙ্গী কখনোই নিখুঁত মানুষ হওয়ার নিশ্চয়তা নয়, কারণ ভুল-ত্রুটি মানুষের স্বভাব। তবে আল্লাহভীতি একজন মানুষকে ভুল বুঝতে, তাওবা করতে, ক্ষমা চাইতে এবং সম্পর্ক রক্ষা করতে উদ্বুদ্ধ করে। এ কারণেই কুরআন ও সুন্নাহ বারবার দ্বীনদারিতাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে।
আমাদের প্রত্যেকের উচিত বিয়ের আগে আন্তরিকভাবে দোয়া করা, ইস্তিখারা করা, প্রয়োজনীয় খোঁজখবর নেওয়া এবং শরিয়তের নির্দেশনা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। আল্লাহ তাআলা যেন আমাদের এমন জীবনসঙ্গী দান করেন, যিনি দুনিয়ায় শান্তির কারণ এবং আখিরাতে জান্নাতের পথে সহযাত্রী হন।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
"হে আমাদের রব! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের আমাদের চোখের শীতলতা দান করুন এবং আমাদের মুত্তাকীদের জন্য আদর্শ বানিয়ে দিন।"
— সূরা আল-ফুরকান, আয়াত ৭৪
আমীন।
আরও পড়ুনঃ
অনিয়মিত মাসিক: কারণ, লক্ষণ, ঝুঁকি ও কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি
স্ত্রীর বুকের দুধ পান করা কি হারাম? এতে কি স্ত্রী স্বামীর জন্য হারাম হয়ে যায়?
নারী-পুরুষের যৌন চাহিদা: শারীরিক, মানসিক ও বৈবাহিক জীবনে এর গুরুত্ব
টেস্টোস্টেরন বা যৌন হরমোন বাড়াতে যে খাবার খাবেন। টেস্টোস্টেরন বাড়ানোর খাবার
যৌ*ন ক্ষমতা বৃদ্ধি করে যেসব খাবার: বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত খাদ্যাভ্যাস ও পূর্ণাঙ্গ গাইড
স্ত্রীর বুকের দুধ পান করা কি হারাম? এতে কি স্ত্রী স্বামীর জন্য হারাম হয়ে যায়?
স্বামী-স্ত্রী একজন আরেকজনের লজ্জাস্থান মুখে নেওয়া কি জায়েজ আছে কি?
স্বামী স্ত্রী একজন আরেকজনের লজ্জাস্থান চুষতে পারবে কি?
স্ত্রীর লজ্জা*স্থান চো*ষা যাবে কি? স্ত্রীর লজ্জা*স্থানে মুখ দেওয়া যাবে কি?
স্ত্রীর দুধ পান করা যাবে কিনা? কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে
স্বামী স্ত্রীর যৌন মিলন বা সহবাসের নিয়ম
কনডম ব্যবহার করা কি ইসলামে জায়েয? কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে
কিছু ভন্ড হুজুর দের তালিকা | চিনে রাখুন। ভণ্ড ধর্মীয় বক্তা চেনার উপায়
কনডম ব্যবহার করা কি ইসলামে জায়েয? কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে
ইসলামী জ্ঞান, শিক্ষা ও সচেতনতার নির্ভরযোগ্য বাংলা প্ল্যাটফর্ম
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আমি জাইমা আরোহি। IslamiTune-এ আপনাকে আন্তরিক স্বাগতম।
লেখক: জাইমা আরোহি
IslamiTune একটি বাংলা ইসলামিক শিক্ষামূলক ও তথ্যভিত্তিক ওয়েবসাইট। আমাদের লক্ষ্য হলো কুরআন, সহিহ সুন্নাহ এবং গ্রহণযোগ্য ইসলামী স্কলারদের ব্যাখ্যার আলোকে নির্ভরযোগ্য ইসলামিক জ্ঞান সহজ, সুন্দর ও বোধগম্য ভাষায় বাংলা ভাষাভাষী পাঠকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

