স্ত্রীর দুধ পান করা যাবে কিনা? কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি

স্ত্রীর দুধ পান করা যাবে কিনা? কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি

স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ইসলামে একটি পবিত্র ও বৈধ সম্পর্ক। বিবাহের মাধ্যমে স্বামী ও স্ত্রী একে অপরের জন্য বৈধ হন এবং তাদের মধ্যে ভালোবাসা, মায়া-মমতা ও ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। দাম্পত্য জীবনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মানুষের মনে নানা প্রশ্ন আসতে পারে। এর মধ্যে একটি প্রশ্ন হলো—স্বামী কি স্ত্রীর দুধ পান করতে পারবেন? ইসলামে এর বিধান কী?

এই বিষয়ে অনেকের মধ্যে বিভ্রান্তি রয়েছে। তাই কুরআন, সহিহ হাদিস এবং ইসলামী ফিকহের আলোকে বিষয়টি বোঝা প্রয়োজন।

 

স্ত্রীর দুধ পান করা যাবে কিনা


কুরআনের আলোকে দুধ পান ও দুধ সম্পর্ক

ইসলামে দুধ পান বা দুধ সম্পর্ক (রিদা‘আ) মূলত শিশুর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অর্থাৎ কোনো শিশু নির্দিষ্ট বয়সের মধ্যে কোনো নারীর দুধ পান করলে সেই নারী তার দুধমা হিসেবে গণ্য হন এবং কিছু আত্মীয়তার বিধান সৃষ্টি হয়।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

"আর মায়েরা তাদের সন্তানদের পূর্ণ দুই বছর দুধ পান করাবে, যারা দুধপানের সময়কাল পূর্ণ করতে চায়।"
(সূরা আল-বাকারা: ২৩৩)

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, ইসলামে দুধ পান করার মূল উদ্দেশ্য হলো শিশুর খাদ্য ও লালন-পালন।


প্রাপ্তবয়স্ক স্বামীর স্ত্রীর দুধ পান করার বিধান

ইসলামী আলেমদের অধিকাংশের মত হলো—স্বামী যদি স্ত্রীর দুধ পান করেন, তাহলে তাদের বৈবাহিক সম্পর্কে কোনো পরিবর্তন আসে না।

অর্থাৎ:

  • স্ত্রী স্বামীর দুধমা হয়ে যাবেন না।

  • স্বামী স্ত্রীর দুধ পান করার কারণে তাদের বিবাহ বাতিল হবে না।

  • তাদের মধ্যে মাহরাম সম্পর্ক সৃষ্টি হবে না।

কারণ ইসলামে দুধ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হওয়ার বিষয়টি মূলত শিশুকালের সঙ্গে সম্পর্কিত।


দুধ সম্পর্কের বয়স সম্পর্কে হাদিস

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

"দুধপান দ্বারা সেই সম্পর্কই প্রতিষ্ঠিত হয়, যা শিশুর ক্ষুধা নিবারণের বয়সে (শৈশবে) হয়।"
(সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)

এই হাদিসের মাধ্যমে বোঝা যায়, প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দুধ পান সাধারণ দুধ সম্পর্কের বিধানের অন্তর্ভুক্ত নয়।


স্বামী-স্ত্রীর ঘনিষ্ঠতার বিষয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

ইসলাম স্বামী-স্ত্রীর বৈধ ঘনিষ্ঠতাকে নিষিদ্ধ করেনি; বরং বৈধ সীমার মধ্যে তা স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

"তোমাদের স্ত্রীগণ তোমাদের জন্য শস্যক্ষেত্রস্বরূপ। অতএব তোমরা তোমাদের শস্যক্ষেত্রে যেভাবে ইচ্ছা আগমন করো।"
(সূরা আল-বাকারা: ২২৩)

এই আয়াতের অর্থ হলো—বৈধ দাম্পত্য সম্পর্কের মধ্যে স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের জন্য বৈধ এবং তাদের মধ্যে ভালোবাসা ও ঘনিষ্ঠতা বৈধ সীমার মধ্যে হতে পারে।


আলেমদের মতামত

ইসলামী ফিকহের বিভিন্ন গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রাপ্তবয়স্ক স্বামী স্ত্রীর দুধ পান করলে দুধ সম্পর্ক সৃষ্টি হয় না।

অধিকাংশ ফকিহের মত:

  • এটি বিবাহের ওপর কোনো প্রভাব ফেলে না।

  • স্বামী-স্ত্রী আগের মতোই বৈধ থাকবেন।

  • তবে বিষয়টি নিয়ে অশালীনতা বা কৌতূহল সৃষ্টি করা উচিত নয়।

ইসলাম সব বিষয়ে শালীনতা ও পরিমিতিবোধ শিক্ষা দেয়।


নারী-পুরুষের যৌন চাহিদা: কারণ, গুরুত্ব বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ

ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিয়ের জন্য আদর্শ পাত্র-পাত্রী নির্বাচন | কুরআন সুন্নাহর আলোকে 

অনিয়মিত মাসিক: কারণ, লক্ষণ, ঝুঁকি করণীয় | Irregular periods: causes, symptoms, risks and what to do

স্ত্রীর বুকের দুধ পান করা কি হারাম? এতে কি স্ত্রী স্বামীর জন্য হারাম হয়ে যায়? ইসলাম কী বলে?

 স্ত্রীর দুধ পান করা কি জায়েজ নাকি অপছন্দনীয়?

এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে কিছু মতভেদ পাওয়া যায়।

অনেক আলেমের মতে:

  • যদি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে এমন কিছু ঘটে, তাহলে তা হারাম নয়।

  • তবে এটিকে অভ্যাস বা বিশেষ উদ্দেশ্যের বিষয় বানানো উচিত নয়।

  • দাম্পত্য সম্পর্কের মূল উদ্দেশ্য হলো ভালোবাসা, শান্তি ও পারস্পরিক সহযোগিতা।

কিছু আলেম এটিকে অপছন্দনীয় বলেছেন, কারণ ইসলামের শালীনতার দৃষ্টিভঙ্গিতে কিছু বিষয় এড়িয়ে চলা উত্তম।


স্ত্রীর দুধ পান করলে কি গোসল ফরজ হবে?

শুধু স্ত্রীর দুধ পান করার কারণে গোসল ফরজ হয় না।

গোসল ফরজ হওয়ার বিষয়গুলো ইসলামী শরিয়তে নির্দিষ্ট। যেমন:

  • স্বামী-স্ত্রীর সহবাস।

  • বীর্যপাত হওয়া।

  • অন্যান্য নির্ধারিত কারণ।

শুধু দুধ পান করার কারণে পবিত্রতার বিধান পরিবর্তন হয় না।


সন্তান থাকা অবস্থায় স্ত্রীর দুধ পান

যদি কোনো নারী সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ান, তখন স্বামীর উচিত বিষয়টি নিয়ে সতর্ক থাকা এবং শিশুর প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া।

মায়ের দুধ শিশুর জন্য আল্লাহর দেওয়া বিশেষ নিয়ামত। তাই সন্তান ছোট হলে তার প্রয়োজন পূরণ করাই অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।


ইসলামে দাম্পত্য জীবনের মূল শিক্ষা

স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো:

১. ভালোবাসা

আল্লাহ স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।

২. সম্মান

একজন আরেকজনের সম্মান রক্ষা করা দাম্পত্য জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

৩. গোপনীয়তা

স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত বিষয় অন্যের কাছে প্রকাশ করা ইসলামে অপছন্দনীয়।

৪. পবিত্রতা

দাম্পত্য সম্পর্ক সবসময় বৈধ ও সুন্দর পথে পরিচালিত হওয়া উচিত।


কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে বলা যায়, স্বামী স্ত্রীর দুধ পান করলে তাদের বৈবাহিক সম্পর্কে কোনো পরিবর্তন হয় না এবং দুধ সম্পর্ক সৃষ্টি হয় না। কারণ ইসলামে দুধ সম্পর্ক মূলত শিশুকালের দুধপানের সঙ্গে সম্পর্কিত।

তবে স্বামী-স্ত্রীর উচিত দাম্পত্য জীবনের সব বিষয়ে ইসলামের শালীনতা, পরিমিতিবোধ ও পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখা। বৈধ সম্পর্ককে ভালোবাসা, দায়িত্ব ও তাকওয়ার মাধ্যমে পরিচালনা করাই একজন মুসলিম দম্পতির জন্য উত্তম পথ।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ দাম্পত্য জীবন গড়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url