ক্ষমা করে দাও,মাফ করে দাও - Khoma Kore Dao Maf Kore Dao | Rajiya Risha - CoMessenger

আল্লাহ, ওগো আল্লাহ


ক্ষমা করে দাও, মাফ করে দাও।

যতদিন এই জীবন-বীনা বাজিবে
সুপথে চালাও, মাফ করে দাও।

তোমাকে না দেখিয়া, নবীকে না চিনিয়া
ঈমান এনেছি তবুও
এ উছিলায় রহম ও দয়া বিলাও।

কউকে সরিনা কাউকে ডরিনা
তোমাতে শির দেই তবুও
এ উছিলায় বিপদে পার করে নাও।

কারো কাছে হারি না, কারো অনুসারী না
তব দারে হাত পাতি তবুও
এ উছিলায় চিরসুখি জান্নাতে দাও।

স্বার্থকে ত্যাগিয়া, বুকে মোরে আগিয়া
মা বাবা গেল গড়ে চলিয়া
এই উছিলায় মা বাবাকে জান্নাতে দাও।

নিশ্চয়ই। এবার একটু রহস্য, আবেগ ও জীবনদর্শন মিশিয়ে একটি বড় গল্প দিলাম।

=============== 

অন্ধকারের ওপারে

শহরের এক প্রান্তে ছিল একটি পুরোনো ঘড়ির দোকান। দোকানটির নাম ছিল "সময়ের গল্প"। আশ্চর্যের বিষয়, দোকানটিতে খুব বেশি মানুষ আসত না, কিন্তু যারা একবার আসত, তারা দ্বিতীয়বারও ফিরে আসত।

দোকানের মালিক ছিলেন বৃদ্ধ মানুষ—হাকিম সাহেব। তাঁর বয়স প্রায় আশি, মাথাভর্তি সাদা চুল, চোখে গোল ফ্রেমের চশমা। তিনি শুধু ঘড়ি মেরামত করতেন না; মানুষের মনও যেন ঠিক করে দিতেন।

একদিন বিকেলে দোকানে ঢুকল রায়হান। বয়স পঁচিশ। বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করেছে, কিন্তু চাকরি নেই। ব্যবসা শুরু করে ক্ষতি হয়েছে। বন্ধুরা দূরে সরে গেছে। নিজের ওপর বিশ্বাসও হারিয়ে ফেলেছে।

সে একটি পুরোনো হাতঘড়ি টেবিলের ওপর রেখে বলল,

"এটা আমার বাবার। অনেক বছর ধরে বন্ধ। যদি ঠিক করা যায়..."

হাকিম সাহেব ঘড়িটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে থাকলেন।

তারপর বললেন,

"ঘড়িটা ঠিক করা যাবে। কিন্তু আগে তোমার একটা প্রশ্নের উত্তর দাও।"

"কী প্রশ্ন?"

"তুমি কি ঘড়িটাকে ঠিক করতে এসেছ, নাকি নিজেকে?"

রায়হান কোনো উত্তর দিতে পারল না।

পরদিন ঘড়ি নিতে এলে বৃদ্ধ বললেন,

"এখনও কাজ শেষ হয়নি। কাল এসো।"

এভাবে টানা সাত দিন চলল।

প্রতিদিনই বৃদ্ধ তাকে একটি করে গল্প শোনাতেন।

প্রথম দিনের গল্প ছিল একটি বীজের, যাকে সবাই মৃত ভেবেছিল। বছরের পর বছর মাটির নিচে পড়ে থাকার পর একদিন বৃষ্টির জলে সে অঙ্কুরিত হয়ে বিশাল বটগাছে পরিণত হয়।

দ্বিতীয় দিনের গল্প ছিল এক মাঝির, যে ঝড়ের ভয়ে নদীতে নামত না। একদিন সে বুঝল, নিরাপদ তীরে বসে থাকলে মাছও ধরা যায় না।

তৃতীয় দিনের গল্প ছিল একটি ভাঙা আয়নার। আয়নাটি ভেঙে গেলেও প্রতিটি টুকরোতে আকাশের ছবি দেখা যেত।

প্রতিটি গল্পের শেষে বৃদ্ধ শুধু একটি বাক্য বলতেন,

"ভাঙা মানেই শেষ নয়।"

সপ্তম দিনের শেষে তিনি রায়হানের হাতে ঘড়িটি তুলে দিলেন।

ঘড়িটি একদম নতুনের মতো চলছে।

রায়হান খুশি হয়ে বলল,

"আপনাকে কত টাকা দেব?"

বৃদ্ধ মুচকি হেসে বললেন,

"টাকা পরে দিও। আগে একটা কাজ করো।"

"কী কাজ?"

"আগামী এক বছরে অন্তত দশজন হতাশ মানুষকে নতুন করে বাঁচার সাহস দেবে।"

রায়হান অবাক হয়ে গেল।

সে দোকান থেকে বেরিয়ে এল।

পরদিন আবার দোকানে এসে দেখে দোকানটি বন্ধ।

পাশের দোকানদার বললেন,

"এই দোকান তো ছয় মাস আগেই বন্ধ হয়ে গেছে।"

রায়হান বিস্ময়ে বলল,

"কী বলছেন! আমি তো গত সাত দিন ধরে এখানে আসছি!"

লোকটি আরও অবাক হয়ে বলল,

"অসম্ভব। হাকিম সাহেব তো ছয় মাস আগে মারা গেছেন।"

রায়হানের হাত থেকে ঘড়িটি প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।

সে দ্রুত দোকানের দরজার দিকে তাকাল।

ধুলোমাখা তালা ঝুলছে।

কোনো মানুষের পায়ের চিহ্ন নেই।

সেদিন রাতে সে ঘড়িটি খুলে দেখল।

ভেতরে একটি ছোট্ট কাগজ ভাঁজ করে রাখা।

তাতে লেখা—

"যদি এই চিঠি পড়ো, তার মানে তুমি এখনো হার মানোনি। মনে রেখো, সময় কখনো মানুষকে হারায় না; মানুষই সময়ের আগে হেরে যায়।"

নিচে কোনো নাম নেই।

শুধু লেখা—

"যে মানুষ তোমার ওপর বিশ্বাস রেখেছিল।"

সেই রাতের পর রায়হানের জীবন বদলে গেল।

সে ছোট একটি অনলাইন ব্যবসা শুরু করল।

প্রথম বছর খুব বেশি লাভ হলো না।

দ্বিতীয় বছর একটু ভালো হলো।

তৃতীয় বছরে তার প্রতিষ্ঠান দেশের বিভিন্ন জেলায় পণ্য পাঠাতে শুরু করল।

কিন্তু সাফল্যের চেয়েও বড় ছিল অন্য একটি কাজ।

প্রতি শুক্রবার সে বিনা পারিশ্রমিকে তরুণদের সঙ্গে বসে গল্প করত।

চাকরি না পাওয়া, পরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়া, ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া—এমন মানুষদের সে নিজের গল্প শোনাত।

তাদের বলত,

"যে দিন মনে হবে সব শেষ, ঠিক সেই দিনই হয়তো নতুন শুরু তোমার দরজায় দাঁড়িয়ে আছে।"

বছর কেটে গেল।

একদিন তার ছেলে পুরোনো সেই ঘড়িটি হাতে নিয়ে জিজ্ঞেস করল,

"বাবা, এই ঘড়িটা এত যত্ন করে রাখো কেন?"

রায়হান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

"কারণ এই ঘড়ি শুধু সময় দেখায় না। এটা আমাকে মনে করিয়ে দেয়—অন্ধকার যত গভীরই হোক, তার ওপারে আলো অপেক্ষা করে।"

ছেলেটি আবার জিজ্ঞেস করল,

"হাকিম দাদুর সঙ্গে আমার কখনো দেখা হবে?"

রায়হান জানালার বাইরে তাকিয়ে হেসে বলল,

"হয়তো হবে। তবে মানুষ হিসেবে নয়। কখনো একজন শিক্ষক হয়ে, কখনো একজন বন্ধু হয়ে, কখনো এমন একজন অপরিচিত মানুষ হয়ে, যে ঠিক সময়ে এসে তোমার জীবন বদলে দেবে।"

বাইরে তখন বৃষ্টি শুরু হয়েছে।

দূরের আকাশে বিদ্যুৎ ঝলসে উঠল।

ঘরের ভেতর টিক... টিক... টিক...

পুরোনো সেই ঘড়ি এখনো চলছে।

সময়ও চলছে।

আর মানুষের হৃদয়ে জ্বালিয়ে যাওয়া আশার আলো—সেটাও।


 

 

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url