স্ত্রীর বুকের দুধ পান করে ফেললে কি স্বামীর জন্য স্ত্রী হারাম হয়ে যায়? স্ত্রীর বুকের দুধ পান করলে কি স্ত্রী হারাম হয়ে যায়? কুরআন-সুন্নাহর আলোকে
দাম্পত্য জীবনে অনেক সময় এমন কিছু প্রশ্ন দেখা দেয়, যেগুলোর উত্তর সাধারণ মানুষের কাছে স্পষ্ট থাকে না। এর মধ্যে একটি বহুল জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন হলো— যদি স্বামী ভুলবশত বা ইচ্ছাকৃতভাবে স্ত্রীর বুকের দুধ পান করে ফেলেন, তাহলে কি স্ত্রী তাঁর জন্য হারাম হয়ে যান?
অনেকেই মনে করেন, স্ত্রীর দুধ পান করলেই স্ত্রী মায়ের মতো হয়ে যান এবং এরপর স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক আর বৈধ থাকে না। আবার অনেকে বলেন, এতে কোনো সমস্যা হয় না। প্রকৃতপক্ষে ইসলামের বিধান কী? কুরআন, সহিহ সুন্নাহ এবং ইসলামী ফিকহ এ বিষয়ে কী বলে?
এই প্রবন্ধে আমরা নির্ভরযোগ্য ইসলামী উৎসের আলোকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করব।
স্ত্রীর বুকের দুধ পান করে ফেললে কি স্বামীর জন্য স্ত্রী হারাম হয়ে যায়? কুরআন-সুন্নাহ ও ফিকহের আলোকে বিস্তারিত আলোচনা
ইসলামে দুধ-সম্পর্ক (রিদা'আহ) কী?
ইসলামে রিদা'আহ (الرضاعة) বা দুধ-সম্পর্ক বলতে বোঝায়—কোনো শিশু নির্দিষ্ট বয়সের মধ্যে কোনো নারীর বুকের দুধ পান করলে সেই নারী তার দুধ-মা এবং তার সন্তানরা দুধ-ভাই-বোন হিসেবে গণ্য হয়।
এ সম্পর্কের কারণে বিবাহের ক্ষেত্রে কিছু স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা সৃষ্টি হয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
"তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে তোমাদের মায়েরা... এবং তোমাদের দুধ-মায়েরা ও দুধ-বোনেরা।"
— সূরা আন-নিসা, ৪:২৩
এই আয়াত প্রমাণ করে যে, ইসলাম দুধ-সম্পর্ককে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং এর মাধ্যমে মাহরাম সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
নারী-পুরুষের যৌন চাহিদা: কারণ, গুরুত্ব ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ
অনিয়মিত মাসিকঃ কারন, লক্ষণ, ঝুঁকি ও করণীয়
মেয়েদের ছোট স্তন বড় করার কিছু উপায় জেনে নিন
স্ত্রীর বুকের দুধ পান করা কি হারাম? এতে কি স্ত্রী স্বামীর জন্য হারাম হয়ে যায়?
কনডম ব্যবহার করা ইসলামে শরিয়তে জায়েয আছে কি?
টেস্টোস্টেরন বা যৌন হরমান বাড়াতে যে যে খাবার খাবেন
স্ত্রীর স্তন চোষা কি স্বামীর জন্য জায়েজ? কুরআন ও সুন্নাহর ব্যাখ্যা
স্ত্রীর লজ্জা*স্থান চো*ষা যাবে কি? স্ত্রীর লজ্জা*স্থানে মুখ দেওয়া যাবে কি?
বাসর রাতে স্বামী স্ত্রীর যৌন মিলন বা সহবাসের নিয়ম
স্বামী স্ত্রী দিনের বেলায় মিলন বা সহ*বাস করা কি জায়েজ?
দুধ-সম্পর্ক কার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য?
এখানেই মূল বিষয়টি রয়েছে।
ইসলামী ফিকহের অধিকাংশ আলেমের মতে, দুধ-সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য কয়েকটি শর্ত রয়েছে।
তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—
দুধ পানকারীকে শিশু হতে হবে।
অধিকাংশ আলেমের মতে, এটি দুই বছর বয়সের মধ্যে হতে হবে।
নির্ধারিত শর্ত পূরণ হলে তবেই রিদা'আহ (দুধ-সম্পর্ক) প্রতিষ্ঠিত হয়।
অতএব, প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির ক্ষেত্রে একই বিধান প্রযোজ্য কি না—এ বিষয়েই মূল আলোচনা।
কুরআনের নির্দেশনা
আল্লাহ তাআলা বলেন—
"মায়েরা তাদের সন্তানদের পূর্ণ দুই বছর পর্যন্ত দুধ পান করাবে—যদি কেউ দুধপান পূর্ণ করতে চায়।"
— সূরা আল-বাকারাহ, ২:২৩৩
এই আয়াতে দুই বছর পর্যন্ত শিশুকে দুধ পান করানোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
ফিকহবিদগণ এ আয়াত থেকে প্রমাণ গ্রহণ করেন যে, দুধ-সম্পর্কের বিধান মূলত শিশুকালের দুধপানের সঙ্গে সম্পর্কিত।
সহিহ হাদিসে কী এসেছে?
হজরত আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
"দুধপান তখনই (দুধ-সম্পর্ক সৃষ্টি করে), যখন তা ক্ষুধার সময় হয় এবং অন্ত্রকে পুষ্ট করে।"
অন্য বর্ণনায় এসেছে—
"দুই বছরের মধ্যে যে দুধপান হয়, সেটিই দুধ-সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে।"
এ বিষয়ক হাদিসগুলো থেকে অধিকাংশ মুহাদ্দিস ও ফকিহ এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, দুধ-সম্পর্কের বিধান মূলত শিশুর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি দুধ পান করলে কী হবে?
এখানেই অধিকাংশ মানুষের বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়।
চার মাযহাবের (হানাফি, মালেকি, শাফেয়ি ও হাম্বলি) অধিকাংশ আলেমের অভিমত হলো—
প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি কোনো নারীর দুধ পান করলে তার মাধ্যমে দুধ-সম্পর্ক (রিদা'আহ) প্রতিষ্ঠিত হয় না।
অর্থাৎ, একজন স্বামী যদি স্ত্রীর বুকের দুধ পান করে ফেলেন, তাহলে শুধুমাত্র এ কারণে স্ত্রী তাঁর জন্য হারাম হয়ে যান—এ কথা অধিকাংশ আলেম গ্রহণ করেননি।
কেন এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে?
এর প্রধান কারণ হলো—
কুরআনের নির্দেশনায় শিশুকালের দুধপানের কথা এসেছে।
সহিহ হাদিসে দুই বছর বয়সের সীমা উল্লেখ রয়েছে।
সাহাবি, তাবেয়ি এবং অধিকাংশ ফকিহের ব্যাখ্যাও একই দিকে ইঙ্গিত করে।
এ কারণে ইসলামী আইনবিদদের সংখ্যাগরিষ্ঠ মত হলো, প্রাপ্তবয়স্কের দুধ পান করার মাধ্যমে মাহরাম সম্পর্ক সৃষ্টি হয় না।
সালিম (রা.)-এর ঘটনা নিয়ে বিভ্রান্তি
অনেকেই সহিহ মুসলিমে বর্ণিত সালিম মাওলা আবু হুযাইফা (রা.)-এর ঘটনার কথা উল্লেখ করেন এবং বলেন, প্রাপ্তবয়স্কের দুধ পানেও দুধ-সম্পর্ক সৃষ্টি হয়।
কিন্তু অধিকাংশ আলেম এ ঘটনাকে বিশেষ একটি ঘটনা (খুসুসিয়্যাহ) হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন, যা সাধারণ বিধান নয়।
ইমাম নববী (রহ.), কাজী ইয়ায (রহ.), ইবনু আবদুল বার (রহ.)সহ বহু আলেম উল্লেখ করেছেন যে, সাধারণ বিধান হলো—শিশুকালের দুধপানের মাধ্যমেই রিদা'আহ প্রতিষ্ঠিত হয়।
অতএব, সালিম (রা.)-এর ঘটনাকে সাধারণ নিয়ম হিসেবে গ্রহণ করা অধিকাংশ আলেমের মতে সঠিক নয়।
(চলবে — পার্ট–২)
চার মাযহাবের দৃষ্টিভঙ্গি
ইসলামী ফিকহের চারটি প্রসিদ্ধ মাযহাব—হানাফি, মালেকি, শাফেয়ি ও হাম্বলি—সাধারণভাবে এ বিষয়ে একমত যে, প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি কোনো নারীর দুধ পান করলে দুধ-সম্পর্ক (রিদা'আহ) প্রতিষ্ঠিত হয় না। দুধ-সম্পর্কের বিধান মূলত শিশুকালের দুধপানের সঙ্গে সম্পর্কিত।
যদিও কিছু ফিকহি খুঁটিনাটি বিষয়ে মাযহাবগুলোর মধ্যে মতভেদ রয়েছে (যেমন কতবার দুধ পান করলে রিদা'আহ প্রতিষ্ঠিত হবে), তবে প্রাপ্তবয়স্কের ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেমের অবস্থান একই।
যদি স্বামী ভুলবশত স্ত্রীর বুকের দুধ পান করে ফেলেন
অনেক সময় শিশুকে দুধ খাওয়ানোর সময়, অথবা দাম্পত্য জীবনের স্বাভাবিক ঘনিষ্ঠতার মধ্যে অনিচ্ছাকৃতভাবে কিছু দুধ মুখে চলে আসতে পারে।
এ ধরনের ক্ষেত্রে অধিকাংশ আলেমের মতে—
স্বামী-স্ত্রীর বিবাহ অক্ষুণ্ণ থাকে।
স্ত্রী স্বামীর জন্য হারাম হয়ে যান না।
নতুন করে নিকাহ করার প্রয়োজন নেই।
দাম্পত্য সম্পর্ক বৈধই থাকে।
অর্থাৎ, শুধুমাত্র স্ত্রীর বুকের দুধ পান হয়ে যাওয়ার কারণে বৈবাহিক সম্পর্ক ভেঙে যায়—এমন কোনো সহিহ দলিল নেই।
ইচ্ছাকৃতভাবে দুধ পান করলে বিধান কী?
এখানে দুটি বিষয় আলাদা করে বুঝতে হবে।
প্রথম বিষয়: এতে কি স্ত্রী হারাম হয়ে যান?
অধিকাংশ আলেমের মতে, না। প্রাপ্তবয়স্কের ক্ষেত্রে রিদা'আহ প্রতিষ্ঠিত হয় না।
দ্বিতীয় বিষয়: এ কাজ করা কি শোভন?
এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। কেউ এটিকে দাম্পত্য জীবনের বৈধ পরিসরের মধ্যে দেখেছেন, আবার কেউ এটিকে মাকরূহ (অপছন্দনীয়) বলেছেন, বিশেষত যদি এটি দুধ পান করাকেই উদ্দেশ্য করে করা হয়। তাই একজন মুসলিমের জন্য শালীনতা ও তাকওয়ার দিকটি বিবেচনা করে চলা উত্তম।
কেন বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়?
বিভ্রান্তির অন্যতম কারণ হলো—
দুধ-মা সম্পর্কিত কুরআনের আয়াত সবার জানা থাকলেও, সেটি শিশুকালের দুধপান-এর সঙ্গে সম্পর্কিত—এই শর্তটি অনেকেই জানেন না।
সামাজিক মাধ্যমে অনেক সময় দলিল ছাড়া ফতোয়া প্রচার করা হয়।
সালিম (রা.)-এর বিশেষ ঘটনাকে সাধারণ বিধান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যদিও অধিকাংশ ফকিহ তা গ্রহণ করেননি।
তাই ধর্মীয় বিষয়ে যাচাই-বাছাই করে মত গ্রহণ করা জরুরি।
ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষা
ইসলাম কোনো বিষয়কে হারাম ঘোষণা করার আগে সুস্পষ্ট দলিলের ওপর গুরুত্ব দেয়। একইভাবে, যেসব বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে, সেসব বিষয়ে পরস্পরের প্রতি সম্মান বজায় রাখার শিক্ষা দেয়।
এ কারণে এ বিষয়ে কোনো মুসলিম দম্পতিকে অযথা আতঙ্কিত করা বা তাদের বৈবাহিক সম্পর্ক ভেঙে গেছে—এমন দাবি করা কুরআন-সুন্নাহর আলোকে সঠিক নয়।
উপসংহার
কুরআন, সহিহ হাদিস এবং চার মাযহাবের সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেমের মতামত অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্ক স্বামী যদি স্ত্রীর বুকের দুধ পান করে ফেলেন—ভুলবশত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে—তাহলে স্ত্রী তাঁর জন্য হারাম হয়ে যান না এবং তাদের বিবাহ বহাল থাকে।
দুধ-সম্পর্ক (রিদা'আহ) প্রতিষ্ঠিত হওয়ার বিধান মূলত শিশুকালের দুধপানের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই এ বিষয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা থেকে বিরত থেকে কুরআন-সুন্নাহ ও নির্ভরযোগ্য ফিকহি ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করা উচিত।
কোনো বিশেষ পরিস্থিতি বা মতভেদপূর্ণ বিষয়ে ব্যক্তিগত ফতোয়ার প্রয়োজন হলে যোগ্য ও বিশ্বস্ত মুফতি বা আলেমের সঙ্গে পরামর্শ করাই সর্বোত্তম।
বিশ্বস্ত রেফারেন্স
পবিত্র কুরআন
সূরা আন-নিসা: ৪:২৩
সূরা আল-বাকারাহ: ২:২৩৩
সহিহ মুসলিম
কিতাবুর রিদা' (Book of Breastfeeding)
জামে আত-তিরমিজি
রিদা' অধ্যায়
সুনানে আবু দাউদ
রিদা' অধ্যায়
ইমাম নববী (রহ.) — শারহু সহিহ মুসলিম
ইবনু কুদামাহ (রহ.) — আল-মুগনি
ইবনু আবদুল বার (রহ.) — আত-তামহীদ
ড. ওয়াহবা আয-যুহাইলী — আল-ফিকহুল ইসলামী ওয়া আদিল্লাতুহু
⚠️ রেফারেন্স যাচাইয়ের সতর্কতা
এই প্রবন্ধে কুরআন, সহিহ হাদিস এবং স্বীকৃত ফিকহি গ্রন্থের আলোকে সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেমদের মতামত উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রকাশের আগে প্রতিটি হাদিসের নম্বর, গ্রেড (সহিহ/হাসান/দাঈফ), আরবি মূল পাঠ এবং উদ্ধৃত ফিকহি মতামত সংশ্লিষ্ট মূল গ্রন্থ থেকে অবশ্যই যাচাই করে নিন। কোনো একটি বিচ্ছিন্ন মতামতকে সর্বসম্মত ইসলামী বিধান হিসেবে উপস্থাপন করবেন না।
ইসলামী জ্ঞান, শিক্ষা ও সচেতনতার নির্ভরযোগ্য বাংলা প্ল্যাটফর্ম
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আমি জাইমা আরোহি। IslamiTune-এ আপনাকে আন্তরিক স্বাগতম।
লেখক: জাইমা আরোহি
IslamiTune একটি বাংলা ইসলামিক শিক্ষামূলক ও তথ্যভিত্তিক ওয়েবসাইট। আমাদের লক্ষ্য হলো কুরআন, সহিহ সুন্নাহ এবং গ্রহণযোগ্য ইসলামী স্কলারদের ব্যাখ্যার আলোকে নির্ভরযোগ্য ইসলামিক জ্ঞান সহজ, সুন্দর ও বোধগম্য ভাষায় বাংলা ভাষাভাষী পাঠকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া।




